বিচার বিভাগকে নীতিতে স্থির হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। তিনি বলেছেন, বিচার বিভাগ ব্যর্থ হলে কোনো সংস্কার টিকবে না। তিনি একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেন, বর্তমান সংবিধান ত্রুটিপূর্ণ হলেও এটি বিচার বিভাগের বৈধতার একমাত্র ভিত্তি।
গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৫’ সম্মেলনের প্রথম দিন ছিল। অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন প্রধান বিচারপতি। আরও বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান এবং নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী। বিভিন্ন দেশের চিন্তাবিদ, রাজনীতিক, কূটনীতিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের নিয়ে চতুর্থবারের মতো ঢাকায় এ অনুষ্ঠান হচ্ছে। এ সম্মেলনে ৮৫টি দেশের ২০০ বক্তা, ৩০০ প্রতিনিধি ও এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দেবেন বলে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছিল সিজিএস।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে প্রধান বিচারপতি বলেন, জুলাইয়ের নাগরিক জাগরণ ছিল বিরল স্বচ্ছতার এক মুহূর্ত। এটি সংবিধানের সঙ্গে নাগরিকদের সম্পর্ক বিশুদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছিল।
সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পুনর্বিন্যাস একটি নতুন সামাজিক চুক্তি; হয়তো একটি নতুন সাংবিধানিক ধারা যুক্ত করতে পারে। এমন মুহূর্তে বিচার বিভাগ সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি– কীভাবে এই বৃহত্তর পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে সংবিধানের মূল চেতনা না হারিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, নির্বাহী বিভাগের বাড়াবাড়ি, জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আইন প্রণয়নজনিত বিকৃতি কিংবা বিচার বিভাগের সীমা লঙ্ঘন; সব ক্ষেত্রে আদালতকে ফেরত যেতে হয়েছে সেই অপরিবর্তনীয় নীতিগুলোর কাছে— ক্ষমতার পৃথক্করণ, বিচারিক স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক শাসন, অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অধিকার ও জনগণের সার্বভৌমত্ব। এগুলো সাংবিধানিক জীবনকে সম্ভব করে তোলে।
তিনি বলেন, আমরা যদি ব্যর্থ হই তবে কোনো সংস্কার– যতই তা প্রশংসিত হোক– দুর্বল শাসন বা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় টিকবে না।
সঠিক পথ বেছে নিতে হবে: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
ভূরাজনৈতিক পুনর্গঠনে ‘সঠিক পথ’ বেছে নিয়ে বাংলাদেশ দায়িত্বশীল সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূমিকায় থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, পুনর্গঠনের সময় অনেক রাষ্ট্রপক্ষ বেছে নিতে আগ্রহী হয়। কিন্তু আমাদের উচিত, প্রথমে ‘সঠিক পথ’ বেছে নেওয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশ নিজেকে একটি সক্রিয়, সার্বভৌম ও দায়িত্বশীল প্লেয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশ নিষ্ক্রিয় করিডোর নয়, আত্মবিশ্বাসী হিসেবে চলতে চায়। আমরা দৃঢ়ভাবে জড়িত থাকব, প্রয়োজনে দৃঢ়ভাবে কথা বলব। জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার দিকে নজর রেখে সর্বদা উৎপাদনশীল অংশীদার হবো।
গণতন্ত্রে বিনিয়োগ করেছে ইইউ: মাইকেল মিলার
শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারিত্ব, পাশাপাশি সংস্কার এবং অবাধ নির্বাচনকে সমর্থন জানিয়েছেন ঢাকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক পশ্চাৎপসরণের প্রবণতাকে প্রতিহত করতে এবং কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য আমরা বাংলাদেশের গণতন্ত্রে বিনিয়োগ করছি।
ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য: মুনীরুজ্জামান
ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান। তিনি বলেন, ভারত আইনত শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। সেই চুক্তির অধীনে ভারত তাঁকে ফেরত পাঠাতে প্রায় আইনত বাধ্য। কল্পনা করুন, যদি বাংলাদেশ কয়েকজন ভারতীয় ভিন্নমতাবলম্বীকে আশ্রয় দেয় এবং নয়াদিল্লির অনুরোধের পরও ফেরত না পাঠায়, তখন ভারতের প্রতিক্রিয়া কী হবে?
এলডিসি ধরে রাখা পুরোনো চিন্তা: অধ্যাপক রেহমান সোবহান
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদার সুরক্ষিত খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, বিশ্ব ব্যবস্থার ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। তাঁর মতে, একসময় সারাবিশ্ব পশ্চিমের শাসনে থাকলেও ক্ষমতার ভরকেন্দ্র এখন ক্রমেই পূর্ব দিকে চলে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন করে সাজাতে হবে। যে বাজারে পুঁজি সবচেয়ে বেশি সহজলভ্য এবং যে বাজারে দীর্ঘস্থায়ী প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে, বাংলাদেশের সেদিকে যাওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
রেহমান সোবহান আরও বলেন, বাংলাদেশ তার নিকটবর্তী দুটি বড় বাজার ভারত ও চীন ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারেনি। ভারত সেই ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশের অধিকাংশ পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়ে রেখেছে। চীনও কয়েক বছর আগে এই সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু আমরা রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে পারিনি।
তিনি বলেন, আমাদের নীতি প্রণেতাদের আরও গতিশীল হতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে আরও উদ্ভাবনী হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের বাজার ধরে রাখা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার সুবিধা পেতে এলডিসি মর্যাদা আরও কিছুদিন ধরে রাখতে চাইছি, তা পুরোনো চিন্তা বলে সমালোচনা করেন রেহমান সোবহান। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের রপ্তানি হয় ৮০০ কোটি ডলারের মতো। কিন্তু সেই বাজার ক্রমেই রাজনৈতিক কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এই অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক কারণে নয়।
দেড় দশকে লাভবান রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলা: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, দেড় দশকে উন্নয়নের যে বয়ান তৈরি করা হয়েছিল, তাতে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলা– এ তিনটি গোষ্ঠী লাভবান হয়েছে। ব্যবসায়ী, আমলা ও রাজনীতিকদের একটি বলয় গড়ে উঠেছিল। ব্যাংক, বিদ্যুৎসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তাদের হাতে।
সাম্প্রতিক কাজের ওপর ভিত্তি করে বিষয়টিকে ‘সংস্কারের সঙ্গে রোমান্স’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের সংস্কারের আমরা তিনটি মূল লক্ষ্য সামনে রেখেছি। এগুলো হচ্ছে ন্যায়বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। এ তিন বিষয়ের কেন্দ্রে আছে সংস্কার। অন্য দুটি লক্ষ্যকে সংযুক্ত করছে এ সংস্কার। ফলে জাতি গঠনে আমাদের অগ্রগতির বিকল্প নেই এবং পেছনে ফিরে তাকানোর অবকাশ নেই।
যত বেশি মিথ্যা, তত বেশি ক্লিক: মাহফুজ আনাম
সামাজিক মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে কার্যত ঘৃণা, বিভ্রান্তি ও মিথ্যাকে অর্থায়ন করা হয়, বলেছেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। একে ‘মিথ্যার বিপদ’ আখ্যা দিয়ে উত্তরণের পথ খোঁজার আহ্বান জানান তিনি। ‘স্পিড টকে’ গতকাল দুপুরে ‘যুদ্ধ, ভঙ্গুর রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার সমাপ্তি’ এবং ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভুয়া তথ্যের হুমকি’ প্রসঙ্গে কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘যত বেশি ঘৃণাপূর্ণ মন্তব্য, যত বেশি তথ্যবিচ্যুতি, যত বেশি মিথ্যা, যত বেশি উস্কানিমূলক লেখা; তত বেশি ক্লিক, আর তত বেশি আয়।’