দেশের বড় ধরনের ঋণ জালিয়াতি মামলার আসামি এবং সমালোচিত ব্যবসায়ী গোলাম সরোয়ার চৌধুরীর ১৬২ কোটি টাকার এফডিআরের খোঁজ মিলেছে দেশের তিনটি ব্যাংকে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ সংক্রান্ত ব্যাংক রেকর্ড তলব করেছে এবং ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে তা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, মামলা দায়ের করা হয়েছে মেসার্স মুরাদ এন্টারপ্রাইজের মালিক গোলাম সরোয়ার চৌধুরীর বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ১১০০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। এ মামলায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান, সাবেক এমডি সহ ৫৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।
তদন্তের জন্য ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের বিভিন্ন শাখা থেকে নথিপত্র তলব করা হয়েছে। এই নথি থেকে জানা যাবে, মেসার্স মুরাদ এন্টারপ্রাইজ যে এফডিআরগুলিতে ১৬২ কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছে, তার বিস্তারিত হিসাব কী এবং এই অর্থ কিভাবে ব্যবহার হয়েছে।
নথিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংকের দেওয়ানবাজার, লালদিঘী ও ঈদগাহ শাখায় ৭০ কোটি টাকার এমটিডিআর, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মোহরা, খাতুনগঞ্জ, পাঁচলাইশ, প্রবর্তক মোড় ও খুলশী শাখায় ১২ কোটি টাকার এফডিআর এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ ও আগ্রাবাদ শাখায় ৮০ কোটি টাকার এমটিডিআর।
দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গোলাম সরোয়ার চৌধুরী মূলত ঋণ পরিশোধ না করে বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করেছেন। তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যাংকের ঋণ ব্যবহার করে অন্য শিল্প গ্রুপের ঋণ পরিশোধ করতেন।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে গোলাম সরোয়ার চৌধুরী ইসলামী ব্যাংকের চাক্তাই শাখায় ঋণ আবেদন করেন। পরের মাসে শাখার কর্মকর্তারা মিথ্যা তথ্য যাচাই না করে ঋণ অনুমোদন করেন। প্রথমে ৮৯০ কোটি টাকা ঋণের আবেদন করা হলেও পরে তা ১,১০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।
দুদক এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোর এমডির বরাবর পৃথক চিঠি প্রেরণ করেছে। ব্যাংকগুলোর রেকর্ডপত্র আগামী ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে দাখিল করতে হবে। এর মধ্যে ঋণ সংক্রান্ত নথি, এফডিআর ও এমটিডিআরের বিস্তারিত তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, এ তথ্যের বিশ্লেষণ করে আসামিদের বিরুদ্ধে আরও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি মামলায় প্রমাণ সাপেক্ষে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে।
গোলাম সরোয়ার চৌধুরীর ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড ও এফডিআরের অবস্থা আন্তর্জাতিক আর্থিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তদন্তে উঠে এসেছে, ঋণ এবং এফডিআর ব্যবহারে অনিয়ম এবং অনুমোদনের ক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
দুদকের এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং ব্যাংকিং সিস্টেমে জালিয়াতি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী দিনে ব্যাংক কর্মকর্তাদের দায়শীলতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের আর্থিক আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে।
এফডিআরের খোঁজের পাশাপাশি দুদক এ ঘটনাকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছে যে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে বৃহৎ পরিসরের অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকি এবং ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা জরুরি।
এতে দেশের আর্থিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখতে এবং ব্যবসায়িক আচরণের প্রতি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সাহায্য হবে।
এই খোঁজ ও নথি তলব প্রক্রিয়া পুরো দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে, যেখানে ঋণ ও এফডিআর ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে করা হবে।