বাংলাদেশ নতুন করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ কর্মসূচির পথে এগোচ্ছে। এবার লক্ষ্য শুধু রিজার্ভ শক্তিশালী করা নয়, বরং ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, রাজস্ব সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানো। সম্ভাব্য ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা করতে ১২ থেকে ১৭ জুলাই আইএমএফের প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসছে।
২০২৩ সালে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়, যা পরে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩৬৪ কোটি ডলার ছাড় হয়েছে। তবে রাজস্ব সংস্কার, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার, জ্বালানি মূল্য সমন্বয় ও ব্যাংক খাত সংস্কারে ধীরগতির কারণে বাকি অর্থ ছাড়ে জটিলতা তৈরি হয়।
নতুন কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি, আমানতকারীর আস্থাহীনতা ও রাজনৈতিক প্রভাব কাটাতে দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, মূলধন পুনর্গঠন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। ব্যাংক রেজুলেশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা সংশোধন বা বাতিলের বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।
জ্বালানি খাতেও বড় সংস্কারের ইঙ্গিত রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, এলএনজি অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস নিয়ে আলোচনা হবে। তবে আইএমএফ সাধারণত ভর্তুকি কমানোর পরামর্শ দেয়। তাই বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে বাজারদরেও চাপ পড়তে পারে।
রাজস্ব খাতে ভ্যাট আধুনিকীকরণ, কর অব্যাহতি কমানো ও করজাল সম্প্রসারণ গুরুত্ব পাবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করহার বাড়ানোর বদলে কর ফাঁকি কমানো জরুরি। তবে সংস্কার ভুলভাবে হলে ব্যয় ভোক্তার ওপর পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ঋণ অর্থনীতিকে স্বস্তি দিতে পারে, যদি সংস্কার সুশাসন, ব্যাংক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করে। কিন্তু জ্বালানি মূল্য, কর ও ভর্তুকি সমন্বয়ের চাপ সামলাতে না পারলে জনজীবনে নতুন উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
অর্থ বিভাগের হিসাবে আগামী তিন অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের আসল পরিশোধেই প্রায় এক হাজার ২২৯ কোটি ডলার লাগবে। তাই নতুন অর্থায়ন না এলে রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় ও বিনিময় হারে চাপ বাড়তে পারে। নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে, সংস্কারের গতি বজায় রেখে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় না করা, বলেছেন বিশ্লেষকেরা। এ কারণেই জুলাইয়ের সফরকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হচ্ছে এখন।