২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে অন্তত ৮৬ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ৩৩৬ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে শিশুদের নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন সংস্থা ‘শিশুরাই সব’। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যবেক্ষণ করে সংস্থাটি এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত শিশু নির্যাতনের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অপরাধ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্তরা শিশুদের পরিচিত ব্যক্তি। বাবা-মা, আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক বা স্থানীয় পরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এসব ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে।
শিশু হত্যার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহত ৮৬ শিশুর মধ্যে ৪৭ জন মেয়ে, ৩৬ জন ছেলে এবং তিনজনের পরিচয় জানা যায়নি। বয়সের দিক থেকে শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি হত্যার শিকার হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রায় ৫০ দশমিক ৫৯ শতাংশ শিশুহত্যার ঘটনা ঘটেছে পারিবারিক পরিবেশে। অর্থাৎ নিজ বাড়ি বা আত্মীয়ের বাসায় এসব ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে ৪১ দশমিক ১৮ শতাংশ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে রাস্তা, মাঠ, বাজার কিংবা জলাশয়ের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে।
অপরাধীদের পরিচয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৭টি হত্যাকাণ্ডে বাবা-মা এবং ১১টি ঘটনায় নিকট আত্মীয়দের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া ২২টি ঘটনায় প্রতিবেশী বা পরিচিত ব্যক্তিরা অভিযুক্ত হয়েছেন। এসব তথ্য অনুযায়ী, অর্ধেকের বেশি শিশুহত্যা পরিচিত মানুষের হাতেই ঘটেছে।
শিশুহত্যার প্রধান কারণ হিসেবে রাগ, পারিবারিক কলহ ও ব্যক্তিগত বিরোধ সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে। এসব কারণে মোট হত্যাকাণ্ডের ২২ দশমিক ৯ শতাংশ ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ৮৬টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৪৪টি ঘটনায় পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করেছে। বেশির ভাগ মামলার তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে।
এদিকে যৌন নির্যাতনের তথ্যেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩১২টি ঘটনায় মোট ৩৩৬ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১২৭ জন মেয়ে শিশু, ২৪ জন ছেলে শিশু এবং ১৮৫ জনের পরিচয় গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এই বয়সের ১৭৫ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যা মোট ঘটনার ৫২ দশমিক ০৮ শতাংশ। এছাড়া শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী ৯০ শিশুও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
যৌন নির্যাতনের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯১টি ঘটনা ধর্ষণ, ৭৫টি ধর্ষণের চেষ্টা, ৪৪টি একাধিকবার ধর্ষণ এবং ২৬টি দলগত ধর্ষণের ঘটনা ছিল। নির্যাতনের পর দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে, ১১ জন গর্ভধারণ করেছে এবং ৩২ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংস্থাটির আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, শিশু অধিকার হরণ এখন জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত বিচার, জাতীয় শিশু কমিশন গঠন, শিশু আইন-২০১৩ কার্যকর বাস্তবায়ন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।