জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২। মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায় ঘোষণার সময় আদালতকক্ষে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মামলার একমাত্র আসামি হিসেবে ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি পৃথক অভিযোগ আনা হয়েছিল।
রায় অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমনে উসকানি, প্ররোচনা এবং সহায়তার অভিযোগে ইনুকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে সহিংসতার উসকানি, উচ্চপর্যায়ের নীতিগত বৈঠকে অংশ নিয়ে দমনমূলক সিদ্ধান্তে সহায়তা, এবং মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়ার অভিযোগ।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইনুর বিরুদ্ধে মূলত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়, আন্দোলনকারীদের তালিকা তৈরি, গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা, এমনকি মারণাস্ত্র ব্যবহারের মতো সিদ্ধান্তে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল তার।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ১৪–দলীয় জোটের এক সভায় উপস্থিত থেকে তিনি ‘শুট অ্যাট সাইট’ নীতির বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন এবং আন্দোলন দমনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে সহায়তা করেন। এছাড়া গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের অভিযোগও আনা হয়।
আরেকটি গুরুতর অভিযোগে বলা হয়, কুষ্টিয়ায় ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যার ঘটনায় নির্দেশনা ও প্ররোচনার সঙ্গে ইনু যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি দেশব্যাপী সহিংসতায় হাজারো মানুষ নিহত ও আহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে রাষ্ট্রপক্ষ।
অন্যদিকে আসামিপক্ষ আদালতে দাবি করে, ইনুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। তবে ট্রাইব্যুনাল সাক্ষ্য-প্রমাণ, টেলিফোন কথোপকথন, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং নথিপত্র বিশ্লেষণ করে রায় ঘোষণা করে।
মামলায় মোট ১০ জন সাক্ষী রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে জবানবন্দি দেন। প্রতিরক্ষা পক্ষ থেকে দুইজন সাফাই সাক্ষী উপস্থাপন করা হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত ইনুকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে।
রায় ঘোষণার পর মামলাটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের এই রায়কে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।