কক্সবাজারে টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ধসের কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ৫ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন। প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি ও বিপন্ন হয়ে পড়েছেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নে। বাসিন্দাদের বাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে আবদুল মালেকের কন্যা হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২) মারা যান। তার দুই বোন জীবিত উদ্ধার হয়ে বর্তমানে চিকিৎসাধীন। আগের দিন কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকায় দুই বছর বয়সী শিশু মোহাম্মদ ওয়াকিম পানিতে ডুবে প্রাণ হারান। এছাড়া চকরিয়া উপজেলার মছনিয়া কাটা এলাকায় পাহাড়ের মাটি চাপা পড়ে দুই শিশুর মৃত্যু ঘটে।
কক্সবাজার সদর, পেকুয়া ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ আরও ২১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম জানান, বান্দরবান শহর থেকে পানি নামতে শুরু করায় মাতামুহুরি নদীর পানি বেড়েছে। চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। চকরিয়া ইউএনও শাহীন দেলোয়ার জানান, চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে এক লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে উদ্ধারকৃতদের জন্য শুকনো খাবার এবং জরুরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদ রহমান জানিয়েছেন, সরকারি হিসেবে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৪ হাজার ৬১ জন আশ্রয় নিয়েছেন। সরকারি বরাদ্দ হিসেবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা নগদ বিতরণ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয় করছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান জানিয়েছেন, গত ৬ দিনে জেলায় ৭শ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিনও মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর ৩ বহাল রয়েছে।সেনা ও বেসামরিক প্রশাসন উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। বন্যা ও পাহাড়ধসের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ কক্সবাজারবাসীর জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে, এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে সকল সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি হয়ে উঠেছে।