দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও পার্বত্য অঞ্চলে অব্যাহত ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে তীব্র বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলা ছাড়াও সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় বন্যা আরও কয়েক দিনে তীব্র আকার নিয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১২ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭ জেলায় মোট ৫৯টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে পানিবন্দী পরিবার সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮ এবং ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন।
চট্টগ্রাম বিভাগের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। জেলার বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী উপজেলার গ্রাম ও বসতঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলার ৩ হাজার ৯৪১টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩৪ হাজার ৭২৩ জন মানুষ অবস্থান করছে। বিশেষ করে বাঁশখালী উপজেলার শেলী আক্তার পাগলকূপের বাড়ি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় প্লাস্টিকের ঝুড়ি ও কাঠের তক্তা দিয়ে মাচা বানিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর মতো বহু পরিবার অনিশ্চয়তায় দিন পার করছে।
কক্সবাজারে বন্যার ভয়াবহতা আরও বেশি। চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, রামু ও সদর উপজেলা পানিতে নিমজ্জিত। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম তলিয়ে গেছে। মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮ জনে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রামে মারা গেছেন ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে একজন। এছাড়া কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে দুইজন নিখোঁজ রয়েছেন।
বান্দরবান শহরের বিভিন্ন এলাকা এখনো পানির নিচে, বিশেষ করে সাঙ্গু নদীর আশেপাশের অঞ্চল। জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, জেলা শহর ও রাস্তাঘাটে পানি নামায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ কিছুটা বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন। কিন্তু বান্দরবান-চট্টগ্রাম ও বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কের অনেক অংশ এখনও পানির নিচে।
রেললাইনও পানিতে ডুবে যাওয়ায় গত মঙ্গলবার ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী এক্সপ্রেস ট্রেন প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে আটকে পড়ে। দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করার জন্য বিজিবি, সেনা ও অন্যান্য জরুরি সেবাদাতা সংস্থা মোতায়েন করা হয়েছে।
রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি ও বরকলসহ বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চলে পানি কমতে শুরু করেছে। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা ও লংগদু সড়কের হেডকোয়ার্টার এলাকা থেকে মানুষের চলাচল স্বাভাবিক হচ্ছে। তবে বান্দরবান ও কক্সবাজারে অনেক মানুষ এখনও আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
হবিগঞ্জে প্রায় ৬,৫০০ পরিবার পানিবন্দী। মৌলভীবাজারের সাত উপজেলার মধ্যে পাঁচটিতে বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সুনামগঞ্জে পাঁচ দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নদ-নদী ও হাওরে পানি বেড়েছে। কুড়িগ্রাম জেলায় নদীগুলোর তীব্র ভাঙন নদীতীরের মানুষকে বিপদে ফেলেছে। যশোরের কেশবপুরে দুই শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
দুর্যোগকালীন ত্রাণ কার্যক্রমে জেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে ৯২৩ মেট্রিক টন চাল, ৭,২৮১ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা নগদ বিতরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরাসরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর মো. ফারুক বলেন, “তিলে তিলে গড়া ঘরটা এক রাতেই শেষ হয়ে গেল। এখন আবার নতুন করে কীভাবে শুরু করব, বুঝতে পারছি না।” এছাড়াও অনেকে খাদ্য, পানি, গবাদিপশু ও ঘরের অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৫ জুলাই থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত এক হাজার ৩৫৪.৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১৫১.৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই-তিন দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতি আরও প্রকট হতে পারে।
বন্যার কারণে এলাকায় নিরাপদ চলাচল সীমিত, কৃষি ও গবাদিপশুর ক্ষতি হয়েছে এবং বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত। জেলা প্রশাসন ও ত্রাণ সংশ্লিষ্ট সংস্থা পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছে এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছে।
এভাবে দক্ষিণ-পূর্ব ও পার্বত্য অঞ্চলসহ সাত জেলায় লাখো মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় অতিদুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৫১, বাড়িঘর ও অবকাঠামোগত ক্ষতি সর্বাধিক। সরকারি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরও পুনর্বাসন ও সাহায্যের জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে।